দ্বৈত নাগরিকদের প্রার্থিতা ‘বৈধ’ ঘোষণা: এক গভীর সাংবিধানিক সঙ্কটের হাতছানি

 

দ্বৈত নাগরিকদের প্রার্থিতা ‘বৈধ’ ঘোষণা: এক গভীর সাংবিধানিক সঙ্কটের হাতছানি

বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী, আইন প্রণেতা বা সংসদ সদস্য হওয়ার জন্য শর্তাবলি অত্যন্ত স্পষ্ট। কিন্তু সাম্প্রতিক কিছু সিদ্ধান্ত বা ব্যাখ্যা যদি দ্বৈত নাগরিকদের নির্বাচনের পথ প্রশস্ত করে দেয়, তবে তা রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামোর সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে।

১. সংবিধানের ৬৬(২) অনুচ্ছেদের লঙ্ঘন

বাংলাদেশের সংবিধানের ৬৬(২)(গ) অনুচ্ছেদে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে:

"কোনো ব্যক্তি সংসদের সদস্য নির্বাচিত হইবার এবং সংসদ-সদস্য থাকিবার যোগ্য হইবেন না, যদি তিনি কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব অর্জন করেন কিংবা কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য ঘোষণা করেন।"

এই ধারাটি অত্যন্ত শক্তিশালী। যদি দ্বৈত নাগরিকদের প্রার্থিতা বৈধ করা হয়, তবে তা সরাসরি সংবিধানের এই অনুচ্ছেদকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানোর শামিল হবে। সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক কোনো আইন বা ঘোষণা শেষ পর্যন্ত আইনি লড়াইয়ে টিকবে না, যা পুরো নির্বাচনী ব্যবস্থাকে প্রশ্নের মুখে ফেলবে।

২. আনুগত্যের সংকট (Conflict of Loyalty)

একজন সংসদ সদস্য রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে কাজ করেন। তিনি যখন শপথ নেন, তখন তিনি দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার অঙ্গীকার করেন। কিন্তু একজন দ্বৈত নাগরিক অন্য একটি দেশের কাছেও অনুগত থাকার অঙ্গীকার করে সেই দেশের নাগরিকত্ব নিয়েছেন।

  • জাতীয় নিরাপত্তা: যদি দুটি দেশের মধ্যে কোনো কূটনৈতিক বা সামরিক বিরোধ দেখা দেয়, তবে ওই ব্যক্তি কার স্বার্থ রক্ষা করবেন?

  • গোপনীয়তা: রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ গোপন তথ্য রক্ষার ক্ষেত্রে দ্বৈত নাগরিকত্ব একটি বড় ঝুঁকি হতে পারে।

৩. রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা

যদি দ্বৈত নাগরিকরা নির্বাচনে অংশ নেন এবং জয়ী হন, পরবর্তীতে উচ্চ আদালত যদি তাদের সদস্যপদ অবৈধ ঘোষণা করে, তবে কী হবে?

  • উপ-নির্বাচনের বোঝা: শত শত আসনে যদি পুনরায় নির্বাচনের প্রয়োজন পড়ে, তবে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের বিশাল অর্থের অপচয় হবে।

  • গৃহীত আইনের বৈধতা: ওই সব সংসদ সদস্যদের ভোটে পাস হওয়া আইনগুলোর বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। এটি রাষ্ট্রকে এক চরম প্রশাসনিক অস্থিতিশীলতার দিকে ঠেলে দিতে পারে।

৪. বৈষম্যের প্রশ্ন

সাধারণ নাগরিকদের জন্য যে নিয়ম কঠোর, এক বিশেষ শ্রেণির জন্য সেই নিয়ম শিথিল করা হলে তা সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদ (আইনের দৃষ্টিতে সমতা) পরিপন্থী হতে পারে। এটি সাধারণ মানুষের মনে বিচারহীনতা এবং পক্ষপাতিত্বের ধারণা তৈরি করবে।


উপসংহার

দ্বৈত নাগরিকদের মেধাকে কাজে লাগানোর অনেক পথ খোলা আছে—উপদেষ্টা হিসেবে বা বিনিয়োগকারী হিসেবে তারা অবদান রাখতে পারেন। কিন্তু দেশের সর্বোচ্চ নীতি-নির্ধারণী জায়গা 'জাতীয় সংসদ'-এ তাদের অংশগ্রহণ সংবিধানের মূল চেতনার পরিপন্থী। দ্বৈত নাগরিকত্ব বজায় রেখে সংসদ সদস্য হওয়া কেবল আইনি জটিলতাই বাড়াবে না, বরং দীর্ঘমেয়াদে দেশের সার্বভৌমত্ব ও সাংবিধানিক স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলবে।

Post a Comment

0 Comments