সাংবাদিকতা: সমাজের দর্পণ ও অতন্দ্র প্রহরী

 

সাংবাদিকতা: সমাজের দর্পণ ও অতন্দ্র প্রহরী

সাংবাদিকতাকে বলা হয় রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ। এর প্রধান কাজ হলো ক্ষমতাকে প্রশ্ন করা, সত্যকে জনসমক্ষে আনা এবং জনগণের পক্ষে কথা বলা। যখন একজন সাংবাদিক নির্ভয়ে কাজ করতে পারেন, তখন সমাজ তার ত্রুটিগুলো দেখতে পায় এবং সংশোধনের সুযোগ পায়। কিন্তু যখন ভয়, দমন-পীড়ন বা কালাকানুনের মাধ্যমে এই কণ্ঠরোধ করা হয়, তখন থেকেই সমস্যার শুরু।


তথ্যের শূন্যস্থান কীভাবে তৈরি হয়?

যখন মূলধারার গণমাধ্যমগুলো সেন্সরশিপের শিকার হয় বা 'সেলফ-সেন্সরশিপ' (নিজে থেকেই সত্য গোপন করা) চর্চা করতে বাধ্য হয়, তখন সাধারণ মানুষ প্রকৃত ঘটনা জানতে পারে না। এই পরিস্থিতিকেই বলা হয় তথ্যের শূন্যস্থান। এটি প্রধানত তিনটি কারণে ঘটে:

  • ভয় ও ভীতি প্রদর্শন: সাংবাদিকদের ওপর হামলা বা মামলার খড়গ ঝুলিয়ে দিলে তারা সত্য বলতে দ্বিধাগ্রস্ত হন।

  • নিয়ন্ত্রণমূলক আইন: সাংবাদিকতার পথকে সংকুচিত করার মতো কঠোর আইন প্রণয়ন।

  • কর্পোরেট ও রাজনৈতিক প্রভাব: গণমাধ্যম যখন নির্দিষ্ট কোনো গোষ্ঠী বা দলের মুখপাত্র হয়ে দাঁড়ায়।


তথ্যের শূন্যস্থান যখন গুজবের চারণভূমি

প্রকৃতি যেমন শূন্যস্থান পছন্দ করে না, তথ্যের জগৎও তেমনি। যখন নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে সঠিক তথ্য আসা বন্ধ হয়ে যায়, তখন সেই জায়গাটি দখল করে নেয় গুজব, অপপ্রচার (Propaganda) এবং ভুয়া খবর (Fake News)

"মানুষ যখন সত্য জানে না, তখন সে যা শোনে তা-ই বিশ্বাস করতে শুরু করে। তথ্যের অনুপস্থিতিতে মানুষের কল্পনা ও আতঙ্ক ডালপালা মেলে।"

১. সোশ্যাল মিডিয়ার অপব্যবহার

পেশাদার সাংবাদিকতার অভাব থাকলে মানুষ অনির্ভরযোগ্য সোশ্যাল মিডিয়া সোর্সের ওপর নির্ভর করতে শুরু করে। এতে সমাজের স্থিতিশীলতা নষ্ট হয় এবং বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়।

২. আস্থার সংকট

সরকার বা রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের ওপর থেকে মানুষের আস্থা চলে যায়। সঠিক তথ্য না পেলে মানুষ ধরে নেয় যে সরকার বড় কিছু গোপন করছে, যা নেতিবাচক ধারণাকে আরও উসকে দেয়।

৩. জবাবদিহিতার মৃত্যু

সাংবাদিকরা যখন প্রশ্ন করতে পারেন না, তখন ক্ষমতাধররা বেপরোয়া হয়ে ওঠে। দুর্নীতি ও অনিয়ম আড়ালে থেকে যায়, যার চূড়ান্ত মাশুল দিতে হয় সাধারণ জনগণকে।


সুস্থ সাংবাদিকতা কেন প্রয়োজন?

একটি দেশের টেকসই উন্নয়নের জন্য তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করা জরুরি। প্রকৃত সাংবাদিকতা শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়, বরং এটি জনমত গঠন ও জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে কাজ করে।

  • স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা: সরকারি ও বেসরকারি কর্মকাণ্ডে স্বচ্ছতা আনে।

  • শিক্ষিত জনমত: জনগণকে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করে।

  • বিপদের আগাম সতর্কবার্তা: দুর্যোগ বা সংকটে সঠিক দিকনির্দেশনা দেয়।


শেষ কথা

প্রকৃত সাংবাদিকতা কোনো বিলাসিতা নয়, এটি একটি মৌলিক অধিকার। সাংবাদিকতার পথ রুদ্ধ করার অর্থ হলো সমাজকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেওয়া। তথ্যের শূন্যস্থান মানেই অরাজকতা আর গুজবের জয়জয়কার। তাই একটি সুস্থ ও সমৃদ্ধ সমাজ গড়তে হলে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই।

মনে রাখতে হবে, যেখানে সাংবাদিকতা থমকে দাঁড়ায়, সেখানে স্বৈরাচার আর 

অপশক্তির উত্থান ঘটে

Post a Comment

0 Comments